ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবহেলার নীরব সাক্ষ্য
পানাম নগর বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও রহস্যঘেরা ঐতিহাসিক নগরী। নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলায় অবস্থিত এই নগরী ঢাকা শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। একসময় পানাম নগর ছিল বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক শক্তিশালী কেন্দ্র।
ইতিহাসবিদদের মতে, মধ্যযুগে সোনারগাঁ ছিল বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী ও বাণিজ্যনগর। বারো ভূঁইয়াদের নেতা স্বাধীন শাসক ঈসা খাঁর শাসনামলেও এই অঞ্চল বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করত। যদিও পানাম নগরকে সরাসরি ঈসা খাঁর রাজধানী হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তবে তাঁর শাসনামলে সোনারগাঁ যে বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
মধ্যযুগীয় এই জনপদের সঠিক ভৌগোলিক সীমা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ঐতিহাসিক নিদর্শন ও গবেষণায় ধারণা পাওয়া যায়, এটি পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা, দক্ষিণে ধলেশ্বরী এবং উত্তরে ব্রহ্মপুত্র নদের বিস্তৃত এলাকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তখনকার সময় নদীপথই ছিল যোগাযোগ ও বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম।
পানাম নগর মূলত একটি বাণিজ্যিক আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে। এখানে বসবাস করতেন ধনী হিন্দু ব্যবসায়ীরা, যাদের ব্যবসা ঢাকা ও কলকাতা কেন্দ্রিক হলেও বিস্তৃত ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের নানা অঞ্চলে। তাঁদের হাতেই গড়ে ওঠে পানামের সারি সারি দোতলা ও একতলা অট্টালিকা। আজ যে ভবনগুলো টিকে আছে, তার বেশিরভাগই উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের। অনেক ভবনের গায়ে এখনো ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের নামফলক দেখা যায়।
পানাম নগরের স্থাপত্যে দেশীয় রীতি ও ইউরোপীয় প্রভাবের এক অনন্য মিশ্রণ লক্ষ করা যায়। ইটের গাঁথুনির সঙ্গে ঢালাই লোহার ব্র্যাকেট, নকশা করা জানালার গ্রিল ও ভেন্টিলেটর এবং লাল-সাদা-কালো মোজাইক কারুকাজ মেঝে এই নগরীর স্থাপত্যকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। নগরীটি ছিল সুপরিকল্পিত। পানির চাহিদা মেটাতে ছিল দুই পাশে দুটি খাল, পাঁচটি পুকুর এবং প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কুয়া বা কূপ।
একসময় পানাম নগর ছিল বাংলার বস্ত্র-বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীপথে ইউরোপ থেকে আসত বিলাতি থানকাপড়, আর এখান থেকে রপ্তানি হতো বাংলার বিখ্যাত মসলিন। নদীর ঘাটে প্রতিদিন ভিড় করত পালতোলা নৌকা, সওদাগর ও বণিকদের আনাগোনায় মুখর থাকত নগরজীবন।
মুঘল আমলে, বিশেষ করে ১৬১১ খ্রিস্টাব্দের পর সোনারগাঁ মুঘলদের অধিকারে এলে সড়ক ও সেতু নির্মাণের মাধ্যমে পানামের সঙ্গে রাজধানী এলাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়। সময়ের সঙ্গে প্রশাসনিক গুরুত্ব কমলেও পানাম দীর্ঘদিন তার বাণিজ্যিক অবস্থান ধরে রেখেছিল।
এই নগরীতে আবাসিক ভবনের পাশাপাশি ছিল মসজিদ, মন্দির, মঠ, গোসলখানা, নাচঘর, পান্থশালা, দরবার কক্ষ, খাজাঞ্চিখানা, বিচারালয় ও গুপ্ত পথ। প্রায় চারশ বছরের পুরোনো টাকশাল বাড়ি এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীলচাষের স্মারক নীলকুঠি আজও পানাম নগরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মসলিন শিল্প ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে যায়। মসলিন শিল্প ধ্বংসের নির্মমতার নানা বর্ণনা ইতিহাসে পাওয়া যায়, যদিও কারিগরদের আঙুল কেটে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এটুকু স্পষ্ট যে ব্রিটিশ অর্থনৈতিক নীতির ফলে দেশীয় বস্ত্রশিল্প ধ্বংস হয় এবং এর পরিবর্তে নীলচাষ চাপিয়ে দেওয়া হয়।
আজ পানাম নগর তার অতীত জৌলুস হারিয়েছে। অযত্ন ও অবহেলায় ভবনগুলোর দেয়ালে শ্যাওলা ধরেছে, গাছপালা গজিয়েছে, শিকড় ঢুকে পড়েছে ঘরের ভেতরে। অনেক ভবনের ছাদ ধসে গেছে, সিঁড়ি ও দেয়াল ভেঙে পড়েছে। চুরি হয়েছে কাঠ ও নির্মাণসামগ্রী। এমনকি ২০০৫ সালে কয়েকটি ভবন সম্পূর্ণভাবে ধ্বসে পড়ে।
আজও পানাম নগর দাঁড়িয়ে আছে বাংলার ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হয়ে। ঢাকা থেকে যাতায়াত সহজ। গুলিস্তান থেকে মোগরাপাড়া গামী যেকোনো বাসে মোগরাপাড়া নেমে, সেখান থেকে অটোরিকশায় মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায় এই নীরব, ভগ্নপ্রায় অথচ গর্বিত নগরীতে।
পানাম নগর শুধু একটি ধ্বংসপ্রায় শহর নয়। এটি বাংলার হারিয়ে যাওয়া গৌরব, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক গভীর স্মারক।

No comments:
Post a Comment